স্থাপত্যবিদ্যা গুরুকুলের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের বাণী

সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ কেবল প্রাকৃতিক ঝড়-ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য মাথার ওপর এক চিলতে ছাদ খোঁজেনি; বরং নিজের বসতিকে রূপ দিয়েছে নিজের শিল্পবোধ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের দর্পণে। গুহাচিত্র আর প্রাক-ঐতিহাসিক কুঁড়েঘর থেকে শুরু করে সিন্ধু সভ্যতার পরিকল্পিত নগর, মিসরের পিরামিড, গ্রীক-রোমান স্থাপত্য, ক্লাসিক্যাল ইসলামী স্থাপত্য কিংবা সুপ্রাচীন বাংলার পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড়ের পোড়ামাটির কারুকাজ—সবখানেই মানুষ ইট, কাঠ আর পাথরের অবয়বে নিজের মনের রূপটি বুনে গেছে। আধুনিককালের পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন আর্কিটেকচার’ কিংবা মিনিমালিস্ট ডিজাইন পর্যন্ত পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ আসলে স্থান (Space) ও মানুষের জীবনযাত্রার এক চমৎকার মানবিক মেলবন্ধন।

আমার কাছে স্থাপত্যবিদ্যা (Architecture) কেবল কিছু রেখাচিত্র, ড্রয়িং বোর্ড, কংক্রিট কিংবা ইট-পাথরের দেয়াল তোলার হিসাব-নিকাশ নয়। স্থাপত্য হলো ইতিহাসকে ধরে রাখার এক জীবন্ত ভাস্কর্য এবং কালপরিক্রমায় অর্জিত মানবিক প্রজ্ঞার (Wisdom) দৃশ্যমান রূপ। একটি ভবন বা স্থান কেবল মানুষকে আশ্রয় দেয় না, বরং তার ভেতরের আলো-বাতাসের খেলা, মানুষের চলাচল, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং পরিবেশের সঙ্গে তার মেলবন্ধনকে লালন করে। কোনো প্রাচীন বা আধুনিক অনন্য স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ালে আমরা কেবল দেয়াল দেখি না, দেখতে পাই সেই সময়ের মানুষের চিন্তা, মেধা ও প্রযুক্তিকে। তাই স্থাপত্য শিক্ষা কেবল নান্দনিকতার পাঠ নয়; এটি ইতিহাস, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে বাঁধার এক গভীর সাধনা।

আমি কোনো পেশাদার স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ বা স্থাপত্যের পণ্ডিত নই। তবে সমাজের একজন সচেতন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অনুধাবন করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে মেধা, নান্দনিক বোধ ও আধুনিক ডিজাইনের প্রতি অনুরাগের কোনো ঘাটতি নেই। ঘাটতি শুধু সেই মেধাকে সুপ্রাচীন ইতিহাস, স্থাপত্য-তত্ত্ব, আধুনিক ড্রাফটিং ও থ্রিডি প্রযুক্তি, স্ট্রাকচারাল জ্ঞান এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই স্থাপত্য দর্শনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের। আমাদের স্থানীয় জলবায়ু, ঐতিহ্য ও মাটির মূল উপাদানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক নকশার মেলবন্ধন ঘটানো আজ সময়ের দাবি।

ঠিক এই চিন্তা থেকেই ‘স্থাপত্যবিদ্যা গুরুকুল’ (architecture.gurukul.edu.bd)-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা বিশ্ব স্থাপত্যের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও তত্ত্ব জানার পাশাপাশি আধুনিক নকশাকৌশল ও প্রযুক্তি হাতে-কলমে শিখবে। ক্লাসিক্যাল আর্কিটেকচার থেকে শুরু করে আধুনিক স্মার্ট সিটি, পরিবেশবান্ধব নকশা ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা—সবকিছুর পেছনের দর্শন ও ভাষাকে তারা যেন অনুধাবন করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত ও চর্চামুখী প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে স্থপতিদের ভূমিকা কেবল নান্দনিক ভবন বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক স্থান নির্মাণ আজ পুরো পৃথিবীর কাছেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের তরুণেরা যদি আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্য-কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারে, তবে তারা কেবল দেশেই পরিকল্পিত নগরায়ণে ভূমিকা রাখবে না, বরং বৈশ্বিক স্থাপত্য অঙ্গনেও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে।

রাতারাতি আমাদের চারপাশের স্থাপত্য ভাবনা বা নগরায়ণের চিত্র বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, আমি জানি। তবে যেকোনো বড় যাত্রার পেছনে থাকে একটি ছোট উদ্যোগ। ‘স্থাপত্যবিদ্যা গুরুকুল’ সেই দীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে স্থাপত্যকে দেখা হবে স্থানকে অর্থপূর্ণ করার, ইতিহাস ও পরিবেশগত প্রজ্ঞাকে লালন করার এবং এক সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের দরদী ভাষা হিসেবে।

তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক ও পেশাগত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ও আগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিচিত্রগামীতা রয়েছে—যা আমার একটি বড় দুর্বলতাও বটে। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে টানা দীর্ঘ সময় পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা বড় সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন খুব বেশি দূর এগোবে না।

তাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষক, গবেষক ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, একে দিকনির্দেশনা দিন এবং ‘স্থাপত্যবিদ্যা গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের অভিজ্ঞ হাত ও নির্দেশনার আলোতেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।

— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা,

স্থাপত্যবিদ্যা গুরুকুল